এক যুগে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে ২০টি বিদ্যালয়

চারপাশে বসতবাড়ি। মাঝে টিনের ছাপরা। সেখানে চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। এর পাশে গাছের নিচে ক্লাস নিচ্ছেন একজন শিক্ষক। তাঁর সামনে চার বেঞ্চে ১২ জন শিক্ষার্থী।

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চরজুজিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের চিত্র এটি। নদীভাঙনে চার বছর আগে বিলীন হয়ে গেছে বিদ্যালয়টি। এরপর জমি ইজারা নিয়ে ছাপরা তুলে বিদ্যালয়টির পাঠদান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ অবস্থায় বিদ্যালয়টির তিন ভাগের দুই ভাগ শিক্ষার্থী কমে গেছে।

শুধু চরজুজিরা নয়, এক যুগে পদ্মার ভাঙনে নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জমিসহ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের পর জমি ইজারা নিয়ে ঘর তুলে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্যালয়গুলো।

ভাঙনের আগে এসব বিদ্যালয়ের একেকটিতে শিক্ষার্থীসংখ্যা ছিল ২২০ থেকে ২৫০। বর্তমানে সেখানে ৭০ থেকে ৮০ জন করে শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বারবার স্থান পরিবর্তন ও স্থায়ী অবকাঠামো না থাকায় আশঙ্কাজনকভাবে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানালেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

Read More:_এক যুগে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে ২০টি বিদ্যালয়

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত এসব প্রাথমিক বিদ্যালয় পদ্মায় বিলীন হয়। বিদ্যালয়গুলো আশপাশের বসতবাড়ি ও জমি ইজারা নিয়ে টিনের ঘর বানিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে বর্ষায় জমি তলিয়ে গেলে অনেক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ থাকে।

সরেজমিনে নড়িয়া ও জাজিরার কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, পদ্মার তীরে বসতবাড়ির মধ্যে জমি ইজারা নিয়ে টিনের ঘর বানানো হয়েছে। ছোট টিনের ঘর, বারান্দা ও গাছের নিচে চলছে পাঠদান। বিদ্যালয়গুলোতে শৌচাগার নেই। নেই নলকূপ। কয়েকটি বিদ্যালয়ে ফসলি জমির ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এরশাদ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয়রা জমি দিলে সরকার ভবন করে দেবে। পদ্মায় বিলীন নড়িয়া ও জাজিরায় ২০টি বিদ্যালয়ের জন্য স্থানীয়ভাবে জমি পাওয়া যায়নি। তাই আপাতত অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

পাঁচ কিলোমিটার দূরে স্থানান্তর

জাজিরার কাজিয়ারচর এলাকায় শাহেদ আলী মাদবরকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। দুটি পাকা ভবনে ৪৪৫ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করা হতো। ২০১২ সালে বিদ্যালয়টি পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। এরপর চার বছর খোলা আকাশের নিচে কার্যক্রম চালানো হয়। কোথাও জায়গা না পেয়ে কাজিয়ারচর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে জাজিরা ইউনিয়নের ফকির মোহাম্মদ আকনকান্দি গ্রামে ১০ শতাংশ জমি ইজারা নেন শিক্ষকেরা। সেখানে দুটি ছাপরা বানিয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। বর্তমানে ৭০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক আছেন সাতজন।

কাজিয়ারচর এলাকার সাঈদ মাদবরের বসতবাড়িও ২০১২ সালে বিলীন হয়। তাঁর দুই সন্তান ওই বিদ্যালয়ে পড়ত। যখন বিদ্যালয়টি জাজিরায় সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন সাঈদও সেখানে অস্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। সাঈদ মাদবর বলেন, সন্তানদের পড়ালেখার কথা ভেবে বিদ্যালয়ের পাশে বসতি গড়েন তিনি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনজিলা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এক যুগ ধরে লড়াই করে বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রেখেছি। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ৩৩ শতাংশ জমি না থাকলে অবকাঠামো বানাবে না সরকার। ওই জমিটুকু পেতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে গিয়েছি।

কিন্তু কারও কোনো সাড়া পাইনি। এভাবে কী বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখা যায়?’ তিনি জানান, প্রতি শতাংশ জমির জন্য বছরে ১ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। এ জন্য সরকারিভাবে তাঁরা কোনো অর্থ বরাদ্দ পান না। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা ভাড়া পরিশোধ করেন।

বারবার ভাঙনের শিকার

নড়িয়ার চরজুজিরা বিদ্যালয়টি প্রথম ভাঙনের মুখে পড়ে ১৯৯৮ সালে। এরপর স্থানীয়ভাবে বিদ্যালয়ের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়। ২০১৩ সালে সেটিও বিলীন হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৮ সালে ভাঙনের পর উত্তর কেদারপুর এলাকায় জমি ইজারা নিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ২০১৮ সালে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ছিল ২২০। বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ৭২ জনে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেলিনা আক্তার বলেন, এভাবে বিদ্যালয় চালানো যায় না। ১০ বছরের চুক্তিতে একটি বাড়ির মধ্যে টিনের ঘর বানিয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। পাঁচ বছর চলে গেছে। এরপর কোথায় যাবেন, জানেন না।

বিশেষ বরাদ্দ নেই

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরে ৬৯৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। প্রতিবছর বিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা উপকরণ কিনতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া বিদ্যালয়ের ছোটখাটো সংস্কারের জন্য রাজস্ব খাত থেকে দেড় লাখ ও প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প-৪ থেকে তিন লাখ করে টাকা বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম আছে। গত তিন বছরে প্রকল্প-৪ থেকে জাজিরার ৪১টি ও নড়িয়ার ৮০টি বিদ্যালয়ে দুই লাখ করে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ ভাঙনকবলিত একটি বিদ্যালয়েও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া গত ১৪ বছরে শরীয়তপুরে অন্তত ১৫০টি বিদ্যালয়ে নতুন পাকা ভবন ও সীমানাপ্রাচীর বানানো হয়েছে। চরাঞ্চলে আশ্রয়ণকেন্দ্র ও স্কুল বানানো হয়েছে অন্তত ৩০টি। যার মধ্যে ভাঙনকবলিত একটিও বিদ্যালয়ও নেই। শুধু নড়িয়ায় ভাঙনের শিকার সাতটি বিদ্যালয়ে ৩ লাখ টাকা করে জরুরি বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালে। তখন অস্থায়ীভাবে টিনের ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়।

সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, শরীয়তপুরে নদীভাঙনের শিকার বিদ্যালয়গুলো স্থাপনের জন্য কোনো খাসজমি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ওই বিদ্যালয়গুলোর জন্য জমি পেতে স্থানীয়ভাবে চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে স্থায়ী ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য সরকার নীতিমালা শিথিল করে জমি অধিগ্রহণ করতে পারে কি না, তা জানতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *